সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

বিষয় : নির্বাচনী সহিংসতা রোধে ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান।

আগামী ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এখনো নাজুক ও অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র বিভাজন, পারস্পরিক অবিশ্বাস, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সরকার একটি শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে — এটি প্রশংসনীয়।
তবে, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে যদি সরকার যথাযথভাবে সতর্ক না থাকে এবং সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই প্রচেষ্টার ইতিবাচক ফলাফল ব্যাহত হতে পারে। অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি বা প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি, নির্বাচনকালীন স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে, যার প্রভাবে সরকারের ইমেজ ও গণ আস্থা সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি ও উদ্বেগ :
১। রাজনৈতিক বিভাজন ও অস্থিরতা
বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও মতপার্থক্য ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিস্থিতি ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক সৃষ্টি করছে, ফলে নির্বাচনী মাঠে সহিংসতার আশঙ্কাও বাড়ছে। এ অবস্থায়, যদি সরকার সময়মতো সব রাজনৈতিক দলকে আলোচনার মাধ্যমে একমতে আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই বিভাজনের প্রভাব সরাসরি নির্বাচনী পরিবেশে পড়বে। রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অবিশ্বাস পরিণত হতে পারে সংঘাত ও সহিংসতায়, যা নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক চরিত্রকে ব্যাহত করবে।
২। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক :
দেশে বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক ও উদ্বেগজনক। পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হত্যা, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, অস্ত্র আইন এবং ডাকাতির মতো গুরুতর অপরাধের হার বেড়েছে। অপরাধ দমনের কার্যক্রম রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে ব্যাহত হচ্ছে। গত বছর ৫ই আগস্টের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশি আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার কারণে নির্বাচনী সহিংসতার আশঙ্কাও ক্রমেই বাড়ছে, যেখানে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়েছে। আসন্ন নির্বাচনে সহিংসতা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও নিরপেক্ষ, পেশাদার ও দক্ষতা-ভিত্তিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবে। বাহিনীর অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে, তারা নির্বাচনী সহিংসতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে না।
৩। পুলিশ সংস্কার কমিশন বাস্তবায়ন না হওয়া :
নির্বাচনের আগে যদি পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন না হয় এবং পুলিশকে কমিশনের অধীনে আনা না হয়, তাহলে নির্বাচনকালে সহিংসতা প্রতিরোধে তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
৪। লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার :
নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচনের পূর্বে লুণ্ঠিত ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নির্বাচনকালীন সহিংসতা, সংঘর্ষ বা সন্ত্রাসী কার্যক্রমে এসব অস্ত্র ব্যবহার হলে সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়তে পারে এবং ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। আমরা আশঙ্কা করছি—যদি নির্বাচনের আগে বাকি লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার সম্ভব না হয় এবং অবৈধ অস্ত্র দমনে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে এর সরাসরি প্রভাব ভোটারদের নিরাপত্তা, নির্বাচনী পরিবেশ এবং সামগ্রিক নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর পড়বে।
৫। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা :
একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্ণ নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে যেসব ব্যক্তি রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে কাজ করেন বা ফ্যাসিবাদ মনোভাব বহন করেন, তাদের নির্বাচন পূর্বেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে না দিলে ভোটারদের মৌলিক অধিকার—বিশেষত নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অবাধ ভোটাধিকারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সুপারিশে যেসব কর্মকর্তা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে পদায়ন বা বদলি হয়েছেন, নির্বাচনকালীন তাদের নিরপেক্ষতা ও পেশাদার ভূমিকা নিয়ে আমাদের গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামোতে পক্ষপাতমূলক অবস্থান নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। একটি সত্যিকার অর্থে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে দলনিরপেক্ষ ও পেশাদার আচরণে ফিরিয়ে আনতে হবে। নিরপেক্ষ প্রশাসন ছাড়া কোনোভাবেই সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব নয়।
৬। অপশক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা :
নির্বাচন ব্যাহত করা বা সহিংসতা উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি শক্তি সক্রিয় রয়েছে। এই শক্তিকে আইনের শাসনের আওতায় আনতে হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ভোটারদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করে। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু রাখতে এসব অপশক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য।
৭। রাজনৈতিক অর্থায়নে জবাবদিহির অভাব :
রাজনৈতিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি জনআস্থাকে দুর্বল করে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনৈতিক অর্থব্যবহার, প্রভাব বিস্তার ও অসম প্রতিযোগিতার ঝুঁকি তৈরি করে।
৮। দলীয় গণতন্ত্রের অভাব :
রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্র চর্চার ঘাটতি, অভ্যন্তরীণ পদ-পদবি ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও আন্দোলনের জন্ম দিচ্ছে। এই ধরনের পরিস্থিতি ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা, ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করতে পারে, যা তাদের মৌলিক ভোটাধিকার প্রয়োগে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
আমাদের আশঙ্কা :
আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যে – যদি রাজনৈতিক বিভাজন নিরসন, পুলিশ সংস্কার কমিশনের বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ, এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা না হয়, তবে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়বে। এই পরিস্থিতি শুধু অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে দুর্বল করবে না, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করতে পারে, যা মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রের বৈদেশিক আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আমাদের দাবি :
মানবাধিকার সংগঠন হিসেবে আমরা মনে করি, একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে সরকারকে অবিলম্বে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে :
১. প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্ণ নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।
২. রাজনৈতিক দলগুলোর ন্যায্য দাবি ও উদ্বেগ সমাধানে জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিভাজন দুর করতে হবে।
৩. লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অবিলম্বে কার্যকর, কঠোর এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করুন, যাতে একটি শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও নিরাপদ
নির্বাচন নিশ্চিত করা যায়।
৪. পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করে নির্বাচনের আগে পুলিশকে কমিশনের অধীনে এনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং
নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. নির্বাচনকালীন সহিংসতা রোধে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও প্রশাসনকে নিয়ে সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো গঠন করতে
হবে।
৬. রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, অনৈতিক অর্থব্যবহার রোধে রাজনৈতিক অর্থায়নকে স্বচ্ছ, আইনসম্মত ও
মানবাধিকারসম্মত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
৭. দলীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করা দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ কমাতে হবে, যাতে
ভোটারদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *